Abishek Porel Exclusive: 'রোজ রাতে কেঁদেছি, বাবা-মায়ের জন্য কষ্ট হতো', জেল থেকে বেরিয়ে সেঞ্চুরির স্বস্তি অভিষেকের
সন্দীপ সরকার, কল্যাণী: অনেকে মজা করে বলতেন, তিনি বাংলা ক্রিকেটের হার্দিক পাণ্ড্য। একইরকম কানে দুল, গলায় চেন, গায়ে ট্যাটু। পরতে পরতে ফ্ল্যামবয়েন্স। অভিষেক পোড়েলের কেরিয়ারের শুরুটাও হয়েছিল রকেটের গতিতে। বাংলা সিনিয়র দলে সুযোগ। আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসে মোটা অঙ্কের চুক্তি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্

সন্দীপ সরকার, কল্যাণী: অনেকে মজা করে বলতেন, তিনি বাংলা ক্রিকেটের হার্দিক পাণ্ড্য। একইরকম কানে দুল, গলায় চেন, গায়ে ট্যাটু। পরতে পরতে ফ্ল্যামবয়েন্স। অভিষেক পোড়েলের কেরিয়ারের শুরুটাও হয়েছিল রকেটের গতিতে। বাংলা সিনিয়র দলে সুযোগ। আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালসে মোটা অঙ্কের চুক্তি। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের স্নেহধন্য ক্রিকেটার ততদিনে জাতীয় স্তরেও বেশ সাড়া ফেলেছেন। তারপর এল এক ঝড়। সব ওলট পালট করে দিয়ে গেল। তাঁর বিরুদ্ধে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সহবাস-সহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছিলেন চিকিৎসক পড়ুয়া এক তরুণী। জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হয়েছিল তাঁর বিরুদ্ধে। গ্রেফতার হয়েছিলেন অভিষেক পোড়েল। পরের ৩৬ দিন কেটেছে গারদের পিছনে। জামিনে মুক্ত হয়ে মাঠে ফিরলেন অভিষেক। কল্যাণীতে বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মাঠে প্রত্যাবর্তনের ম্যাচেই করলেন সেঞ্চুরি। দিল্লির বিরুদ্ধে তিন অঙ্কের রানে পৌঁছেই আবেগ ধরে রাখতে পারলেন না। প্রথমে ইঙ্গিত করে বোঝালেন, তাঁর হয়ে কথা বলবে ব্যাট। তারপরই হাঁটু মুড়ে বসে কাঁদতে দেখা গেল চন্দননগরের উইকেটকিপার-ব্যাটারকে। স্বস্তির অশ্রু। সোমবার বাংলা বনাম দিল্লি রঞ্জি ট্রফির ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের খেলার শেষে কল্যাণীর বেঙ্গল ক্রিকেট অ্যাকাডেমির মাঠে এবিপি লাইভ বাংলাকে দীর্ঘ, একান্ত সাক্ষাৎকার দিলেন অভিষেক পোড়েল। ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠল চেপে রাখা যন্ত্রণা আর ঘুরে দাঁড়ানোর শপথের কথা। ফোন ছেড়ে চার দেওয়ালের কুঠুরিতে গ্রেফতার হওয়ার পর চুঁচুড়ায় হুগলি সংশোধনাগারে ছিলেন অভিষেক। মানুষ খারাপ সময়ও মনে রাখে, শিক্ষা নেয়। ভারতের অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপের দলে সুযোগ না পেয়ে সিঙ্গারা-বালুসাইয়ের পার্টি করেছিলেন মহেন্দ্র সিংহ ধোনি। দিনটিকে, উপেক্ষিত হওয়ার যন্ত্রণাকে মনে রাখবেন বলে। কারাগারে কাটানো অন্ধকার দিনগুলি থেকে কি সেরকম কোনও মুহূর্ত মনে রেখে দিলেন, যা ভবিষ্যতে সাফল্যের প্রেরণা হবে? অভিষেক বলছিলেন, 'আমার কাছে ফোন ছিল না। এক-একটা সেকেন্ড মনে হতো এক-এক ঘণ্টা। এক-এক ঘণ্টা মনে হতো এক-এক দিন। প্রথম ২-৩ দিন আমার কান্না পেয়ে যেত। মনে হতো কোথায় চলে এলাম। ৩৬ দিন আমার কাছে ৩৬ বছর ছিল যেন। সেই ৩৬টি দিনের প্রতি মুহূর্ত আমাকে বলে, ভাল কিছু করতে হবে। আজ মাঠেও প্রত্যেকটি বল খেলার সময় মনে হচ্ছিল কী গিয়েছে আমার ওপর দিয়ে।' বাবা-মায়ের সঙ্গে সপ্তাহে একদিন ১০ মিনিট করে দেখা জেলবন্দি থাকার সময় অভিষেকের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বাবা-মায়ের মুখোমুখি হওয়া। বলছিলেন, 'সপ্তাহে একদিন করে ১০ মিনিটের জন্য বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে দিত। গারদের এপার-ওপার থাকতাম। পরিবারের ওপর দিয়েও ঝড় গিয়েছে। বাবা দৌড়াদৌড়ি করতেন। আমার চেয়েও বেশি বাড়ির লড়াই। দেখা করার সময় আমাকে শক্ত থাকতে হতো। তাও কয়েকবার কেঁদে ফেলেছি। রাতে ঘুমনোর আগে রোজ চোখে জল আসত।' কেমন ছিল জেলজীবন? জেলজীবন নিয়ে অভিষেক বললেন, 'আমাকে যে ঘরে রাখা হয়েছিল, সেখানে আমার সঙ্গে ছিলেন আরও দুজন আসামী। তাঁরা রাজনৈতিক মামলায় অভিযুক্ত। জানালা খোলা যেত। জানালার বাইরে গাছ দেখা যেত। সারাদিন গাছের পাতা গুনতাম। কটা প্লেন উড়ে যাচ্ছে গুনতাম। ঘরে পাখা ছিল। সহবন্দিরা খুব ভাল ব্যবহার করেছে। আমাকে কোনও কাজ করতে হতো না। দুবেলা রুটি, আলুর তরকারি, ভাত ও ডাল খেয়েছি। সেই জীবন আমাকে মানসিকভাবে আরও শক্তিশালী করেছে।' মন খারাপ করলে হনুমান চল্লিশা মাঝে মধ্যে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তেন। অভিষেক বলছেন, 'দুর্বল সময়ে হনুমান চল্লিশা পাঠ করতাম। মনে জোর পেতাম। জেলটাকে জেল হিসাবে ভাবা বন্ধ করে দিতে একটু স্বস্তি পেয়েছিলাম। জেলের জীবন আমাদের স্বাভাবিক জীবনের মতো এত দ্রুত নয়। মন্থর গতির। মনে হতো, একদিন তো সূর্য উঠবেই। মনে মনে ভাবতাম, ছাড়া পেলে মাঠে ফিরব। ক্রিকেটকে জীবনের সর্বস্ব দেব। আমি খুব নিম্নবিত্ত পরিবার থেকে উঠে এসেছি। অনমেক লড়াই করেছি। খারাপ স্মৃতি ভুলে মাঠে ফিরে নতুন করে শুরু করতে চেয়েছি। এখনও আমার দিন শুরু হয় হনুমান চল্লিশা পাঠ করে, দিন শেষও হয় তা দিয়ে।' ২ রানে পড়ল ক্যাচ, ভাগ্য দিয়েছে সঙ্গ সোমবার ২ রানে তাঁর সহজ ক্যাচ পড়েছিল। আয়ূষ বাদোনির পরে স্লিপে লোপ্পা ক্যাচ ফেলেন দেন সনৎ সাঙ্গওয়ান। তারপর নিজেকে নতুন অঙ্গীকারে বেঁধে ফেলেন বাঁহাতি ব্যাটার। ৭০ বলে হাফসেঞ্চুরি। সেঞ্চুরি করলেন ১৩৭ বলে। দিনের শেষে ১১৪ রানে অপরাজিত অভিষেক। বলছিলেন, 'ক্যাচটা পড়ার পর ভাগ্যকে ধন্যবাদ দিই। অনেকের লড়াই রয়েছে আমার ফিরে আসার নেপথ্যে। কোচ লক্ষ্মীরতন শুক্ল আগলে রেখেছেন। জেল থেকে বেরনোর পর প্র্যাক্টিস করানোর জন্য সল্ট লেকে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ডেকে নিতেন। জয়দীপ মুখোপাধ্যায় স্যর থাকতেন। চড়া রোদে আমাকে প্র্যাক্টিস করাতেন লক্ষ্মীদা। প্রস্তুতির দিক থেকে অন্যদের চেয়ে পিছিয়ে ছিলাম। সেই খামতি দূর হয়ে গিয়েছিল ওই প্র্যাক্টিস সেশনগুলিতে। দলের ছুটির দিনও প্র্যাক্টিস করেছি। তার ফল পেলাম আজ মাঠে। আগে ৫০-৬০ রান করে আউট হয়ে যেতাম। তবে আজ ঠিকই করেছিলাম, বড় খেলব।' সৌরভের পরামর্শ, লক্ষ্মীর দাওয়াই সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রিয়পাত্র অভিষেক। খারাপ সময় কাটিয়ে ওঠার জন্য দিয়েছিলেন টোটকা। অভিষেক বলছেন, 'সৌরভ স্যর বলেছিলেন, সকলের জীবনেই এরকম খারাপ সময় আসে। অত ভাবিস না। ক্রিকেটে ফোকাস কর। এটা একটা অধ্যায়, ভাল করে খেল, কাটিয়ে উঠবি। লক্ষ্মীদা তো পাশে ছিলই। নিজের ছেলের মতো করে আগলে রেখেছে। সিএবি কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস স্যর পাশে থেকেছেন।' ঈশান-অভিষেকদের ফোন অভিষেক বললেন, 'আমি জেল থেকে বেরিয়ে শুনেছি, ঈশান কিষাণ, অভিষেক শর্মা, দিল্লি ক্যাপিটালসে আমার সতীর্থ আশুতোষ শর্মারা ফোন করে খোঁজ নিয়েছে। কোনও সাহায্যের দরকার কি না জানতে চেয়েছে। সেটা আমার কাছে বড় পাওনা। বাংলা দলে ফেরার পর সতীর্থরা বুঝতেই দেয়নি কিছু। অভিমন্যু ঈশ্বরণ, সুদীপ ঘরামি, করণ লাল কাকে ছেড়ে কার কথা বলব, সকলেই পাশে থেকেছে। মজা করেছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে দিয়েছে।' আরও পড়ুন: জেলমুক্তির ২৫ দিন পরেই সেঞ্চুরি, মাঠে কাঁদলেন অভিষেক পোড়েল, কোহলি-সেলিব্রেশন কল্যাণীতে