Bengal Cricket: কখনও দরপত্র চাওয়া হয়নি, CAB-র দাবি উড়িয়ে বললেন মাটি সরবরাহকারীরা, বাংলার ক্রিকেটে অস্বস্তি
সন্দীপ সরকার, কলকাতা: অভিযোগ উঠেছিল, প্রত্যেক বছর 'অবৈধ' মাটি কিনে পিচ তৈরির জন্য অনুমোদিত ক্লাব ও সংস্থাগুলিকে তা সরবরাহ করে সিএবি! এবিপি লাইভ বাংলা সেই খবর প্রকাশ করতেই শোরগোল পড়ে যায় ময়দানে। যার জেরে বৃহস্পতিবার দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছিল সিএবি। দাবি করা হয়েছিল, সবরকম নিয়ম-নীতি মেনে, মাটি সরবরাহক

সন্দীপ সরকার, কলকাতা: অভিযোগ উঠেছিল, প্রত্যেক বছর 'অবৈধ' মাটি কিনে পিচ তৈরির জন্য অনুমোদিত ক্লাব ও সংস্থাগুলিকে তা সরবরাহ করে সিএবি! এবিপি লাইভ বাংলা সেই খবর প্রকাশ করতেই শোরগোল পড়ে যায় ময়দানে। যার জেরে বৃহস্পতিবার দীর্ঘ বিবৃতি দিয়েছিল সিএবি। দাবি করা হয়েছিল, সবরকম নিয়ম-নীতি মেনে, মাটি সরবরাহকারীদের কাছ থেকে দরপত্র (কোটেশন) নিয়ে তারপর মাটি কেনা হয়। বিবৃতিতে এ-ও দাবি করা হয়েছিল যে, ২০১০ সাল থেকে এই পদ্ধতি মেনেই পিচের মাটি কেনা চলছে। কোথাও কোনও আইন ভাঙা হয়নি। সরকারি নিয়মলঙ্ঘন করা হয়নি। পুরো ব্যাপারটাই স্বচ্ছ। সেই বিবৃতির পরে নতুন করে অন্তর্তদন্তে নেমে এবিপি লাইভ বাংলা অবশ্য এমন সব তথ্য হাতে পেল, যা সিএবি-র দাবিকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে। সিএবি-র বিবৃতির ভিত্তি আদৌ রয়েছে কি না, নিজেদের মুখরক্ষায় ভুল তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠে যেতে পারে জোরালভাবে। এমন দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে, যাঁরা অন্তত গত ৬ বছর ধরে পিচ তৈরির জন্য মাটি বিক্রি করছেন সিএবিকে। মণিরুল হক এবং জামালউদ্দিন। দুজনেরই বাড়ি উত্তর ২৪ পরগনার শাসনে। দুজনই সাফ জানিয়ে দিলেন, মাটির জন্য় কোনও টেন্ডার হয় না। দরপত্র চাওয়া হয় না। ব্যক্তিগত পরিচিতির মাধ্যমেই তাঁরা সিএবিকে মাটি বিক্রি করে এসেছেন। এবং টাকা পেয়েছেন কেউ নগদে, কেউ ফোন পে মারফত। নিজেরা কোনও পাকা বিল জমা না দিয়েই! এবং, দুজনের কারওই মাটি কাটার বৈধ কাগজপত্র নেই। তবে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর আর সেটা সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে এখন পেশাই বদলে ফেলেছেন! গত বছর সিএবি-কে পিচ তৈরির মাটি দিয়েছিলেন মণিরুল হক। এবিপি লাইভ বাংলাকে বলছিলেন, 'এ বছর রাজনৈতিক পালাবদলের পরে পুলিশ প্রশাসন আর বৈধ কাগজপত্র না থাকলে মাটি কাটতে দিচ্ছে না। মাটি নিয়ে যেতে গেলে পুলিশ গাড়ি আটকাচ্ছে। কেস দিচ্ছে। সুরাহার জন্য সিএবি থেকে দুই প্রতিনিধি জেলাশাসকের অফিসে এসেছিলেন। আমাকেও সেখানে ডাকা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের এক কর্তা সেদিন বলেছিলেন, তাঁরা ছাড়পত্র দিয়ে দিলে পুলিশ আর গাড়ি ধরবে না। পরেরদিন দেখা করতে বলেন। গিয়েছিলাম। সেদিন ওই কর্তা ছিলেন না। কাগজও তৈরি হয়নি। আবার সোমবার যেতে বলেছেন। দেখি সেদিন কী হয়।' মণিরুল জানালেন, কোন জমি থেকে মাটি কাটা হচ্ছে, সেই জমির দাগ নম্বর ও খতিয়ান চাওয়া হয়েছিল অতিরিক্ত জেলাশাসকের অফিসে। বলছেন, 'আমরা সেই জমির বিস্তারিত তথ্য দিয়েছিলাম। তবে সেই জমি এখন হাতবদল হয়েছে। এখন ঝুনঝুনওয়ালা নামে এক ব্যক্তি কিনেছেন। তাই সেই জমির মাটি কাটা নিয়ে আপত্তি জানান প্রশাসনিক কর্তা। জমিমালিকের অনুমতি লাগবে বলে জানান।' মণিরুল যোগ করলেন, 'রাজ্যে পালাবদলের পর আমাদের মাটি কাটার কাজ বন্ধ। আমাদের তো বৈধ কাগজপত্র নেই। অত পয়সাও নেই। তাই এখন রাজমিস্ত্রির কাজ করছি। সংসার তো চালাতে হবে। ডিএম অফিস যদি ছাড়পত্র দেয়, তখন দেখা যাবে।' গত মরশুমে কতটা মাটি দিয়েছিলেন সিএবিকে? মণিরুল বললেন, '২০ গাড়ি।' কীভাবে জানলেন সিএবি মাটি কিনবে? যোগাযোগ হয়েছিল কীভাবে? সিএবি কি কোনও টেন্ডার করেছিল বা ওয়েবসাইটে, সোশ্যাল মিডিয়ায় কোনও দরপত্র চেয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল? মণিরুলের সাফ স্বীকারোক্তি, 'না। আমি সিএবি-র কিউরেটর বীরুদার (বীরেন্দ্রপ্রতাপ সিংহ) মারফত যোগাযোগ করি। কোনও দরপত্র দিতে বলা হয়নি। আমাকে সিএবি থেকে তিনটি কাগজ দেওয়া হয়েছিল। বলেছিল, এই কাগজ দেখালে পুলিশ গাড়ি আটকাবে না। লরি পিছু কত টাকা লাগবে, সেটাই বলেছিলাম। ১২ হাজার টাকা লরি প্রতি নিয়েছিলাম।' মাটি বিক্রির বিনিময়ে কোনও রশিদ দিয়েছিলেন? 'না। লরির হিসেব করে নগদ টাকা নিয়ে এসেছিলাম সিএবি অফিস থেকে। আমাদের কোনও বিল, প্যাড এসব তো নেই। পাঁচজন মিলে কাজ করি, আমরা পাঁচজনই মাটি কেটে গাড়ি লোড করে নিয়েছিলাম। তবে এবার জ্বালানির দাম বেড়েছে ফলে মাটি দিতে হলে দাম বাড়াতে হবে,' বললেন মণিরুল। যোগ করলেন, 'আমাদের এলাকায় মাটি কাটার কাজ পুরো বন্ধ। আমাদের তো ওপর মহলে কোনও যোগাযোগ নেই। সিএবি যদি অনুমতি পায়, তবেই মাটি দিতে পারব।' গত বছর পর্যন্ত সিএবি-কে মাটি দিতেন জামালউদ্দিন। তাঁরও বাড়ি শাসন এলাকায়। ৫-৬ বছর ধরে মাটি দিয়েছেন সিএবিকে। বললেন, 'প্রত্যেক মরশুমে মোটামুটিভাবে ৫০ লরি মাটি দিয়েছি। জমির মালিকের অনুমতিপত্র জমা দিতে বলছে এখন। জমির মালিক কখনওই সেই অনুমতি দেবেন না। সিএবি ছাড়া অন্যান্য মাঠেও মাটি দিই। তবে আমাদের তো মাটি কাটার লাইসেন্স নেই। পুলিশ খুব ধরপাকড় করছে। এত মামলা-মকদ্দমা সামলাব কীভাবে? আমরা গরিব মানুষ। তাই মাটি কাটার কাজই ছেড়ে দিয়েছি।' কীভাবে জানতে পারতেন যে সিএবি মাটি কিনবে? জামালউদ্দিন বললেন, 'আমি বহুদিন ধরে মাটি দিই বিভিন্ন মাঠে। পানিহাটির একটা মাঠে মাটি দিয়েছিলাম। সেই মাঠটি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সিএবি-র কিউরেটর বীরেন্দ্র প্রতাপ সিংহ। তাঁর মাধ্যমেই সিএবি-র সঙ্গে যোগাযোগ হয়।' কোনও দরপত্র দিতে হতো? 'না। ৪০৭ গাড়িতে করে মাটি বোঝাই করে নিয়ে যেতাম। গাড়ি প্রতি ১২ হাজার টাকা নিতাম,' বললেন জামালউদ্দিন। পাকা বিল দিতেন? জামালউদ্দিন বললেন, 'আমাকে বলত বিল দিতে। আমি সেসব কোথায় পাব? বীরুদা, মদন ঘোষ বা সিএবি-র যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদেরই বলতাম, আপনারা বিল বানিয়ে দিন। আমাকে ফোন পে মারফত টাকা মেটানো হতো।' যদিও খোঁজ নিয়ে জানা গেল, সিএবি-র কোনও ফোন পে, গুগল পে পেমেন্টের ব্যবস্থাই নেই! জেলাশাসকের দফতর থেকে যে বৈধ মাটি সরবরাহকারীদের থেকে সিএবি-কে মাটি কিনতে বলা হয়েছে, শুনেছেন জামালউদ্দিন, মণিরুলরা। তাঁরা বললেন, 'পুলিশ রাস্তায় ধরলে জরিমানা করত। একবার ওভারলোড করার জন্য মোটা টাকা জরিমানা হয়েছিল।আমাদের লাইসেন্স নেই। যদি লাইসেন্স কীভাবে বার করা যায় জানতে পারি, সেই চেষ্টা করব।' আরও পড়ুন: 'অবৈধ' মাটি কাণ্ডে ধোঁয়াশা বাড়াল সিএবির বিবৃতি, স্বচ্ছতা মানা হচ্ছে কি না, জোর বিতর্ক