Kali Puja Unknown Story: রাতে মন্দির থেকে ঘুরতে বেরোতেন কালীমূর্তি, শাড়িতে লেগে থাকত চোরকাঁটা! অবাক করা এক লোকশ্রুতি
তোর্ষা ভট্টাচার্য্য, কলকাতা: বীরভূমের আকালিপুর। শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই গ্রামে এখনও যে প্রচুর মানুষ যাতায়ত করেন, এমনটা নয় মোটেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকালিপুর কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া পেলেও, এখানে এখনও কান পাতলেই শোনা যায়, অতীতের কত কথা। এই গ্রামেই রয়েছে, গুহ্য কালীর মন্দির। স্থানীয়দের বিশ্বাসে এই কালী

তোর্ষা ভট্টাচার্য্য, কলকাতা: বীরভূমের আকালিপুর। শহরের উপকণ্ঠে অবস্থিত এই গ্রামে এখনও যে প্রচুর মানুষ যাতায়ত করেন, এমনটা নয় মোটেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আকালিপুর কিছুটা আধুনিকতার ছোঁয়া পেলেও, এখানে এখনও কান পাতলেই শোনা যায়, অতীতের কত কথা। এই গ্রামেই রয়েছে, গুহ্য কালীর মন্দির। স্থানীয়দের বিশ্বাসে এই কালী প্রতিমা ভীষণ জাগ্রত। কিন্তু এই মন্দিরের পিছনে, দেবী প্রতিমার পিছনে মিলেমিশে রয়েছে যে ইতিহাস এবং লোকশ্রুতি, তা সত্যিই বেশ আকর্ষণীয়। বারণসী থেকে উদ্ধার হওয়া এই মূর্তি, কীভাবে পৌঁছে গেল বীরভূমের এই প্রত্যন্ত গ্রামে? গুহ্য কালীর কৃপায়, বেঁচে উঠেছিল মৃত কিশোর? এই মন্দির ঘিরে রয়েছে অদ্ভুত সব বিশ্বাস। ১৭৭৫ সালের ৫ আগস্ট কলকাতায় মহারাজা নন্দকুমারকে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। ব্রিটিশ শাসনকালে এটাই ছিল কোনও ভারতীয়র প্রথম বিচারবিভাগীয় ফাঁসি। তৎকালীন কলকাতার মানুষেরা এই ফাঁসি মেনে নিতে পারেননি। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন তাঁরা। অনেকেই সেই সময়ে, বাড়ি ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। সেই সময়েই গুহ্য কালীর এই মূর্তিকে নিয়ে আসা হয়েছিল বীরভূমের এই আকালিপুর এলাকায়। মতান্তরে অনেকে আবার বলেন, এই গুহ্য কালী প্রতিমাটি মগধরাজ জরাসন্ধের কালী যেটা অশোক এবং বিম্বিসারের সময়ে বিহারে চলে যায়। বারাণসীর মাটির তলায় মিলল মূর্তি, লুকিয়ে রাখা হল বাংলার গ্রামে! অনেক জায়গায় আবার প্রচলিত রয়েছে আরও এক মত। সেখান থেকে জানা যায়, কাশীর রাজা চেত সিং,জলের খোঁজে জমি খননের সময়ে এই কালী প্রতিমাটি পেয়েছিলেন। মাটির তলা থেকে কালী প্রতিমা পাওয়া গিয়েছে, এই খবর ছড়িয়ে পড়ে দূরদূরান্তে। এই খবর পৌঁছে যায়,ওয়ারেন হেস্টিংসের কাছেও। এক ভারতীয় বাঙালিই সরকারের নেকনজরে থাকার জন্য এই খবর তাঁর কানে তুলে দিয়েছিলেন। হেস্টিংস জানতে পারেন, কাশীর রাজা চেত সিংহের বাড়িতে একটি কোষ্ঠিপাথরের মূর্তি রয়েছে, যার দাম হতে পারে কয়েক হাজার কোটি টাকা। তিনি চেত সিংহের কাজ থেকে এই মূর্তি লুঠ করে, জলপথে ইংল্যান্ডে নিয়ে যাচ্ছিলেন। সেই সময়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ান ছিলেন নন্দকুমার। তিনি হেস্টিংসের কাছ থেকে সেই মূর্তি উদ্ধার করে, সেটিকে পাঠিয়ে দেন বীরভূমের আকালিপুরে। অনেকেই মনে করেন, ব্রিটিশদের হাত থেকে এই মূর্তিকে রক্ষা করতেই, এই প্রত্যন্ত গ্রামে গুহ্য কালী প্রতিমাটিকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন নন্দকুমার। দিল্লি, মুম্বই, কলকাতার মতো বড় শহরেই ছিল ইংরেজদের যাতায়াত। ব্রিটিশের কাছে প্রত্যন্ত গ্রাম আকালিপুরের খবর ছিল না। এই আকালিপুরের পাশের গ্রাম,নন্দপুরেই ছিল নন্দকুমারের বাড়ি। মাঝিরা নদীপথে এই মূর্তি নিয়ে আসছিলেন। কথা ছিল, আকালিপুর নয়, মূর্তি নিয়ে গিয়ে স্থাপন করা হবে, নন্দপুরে। কিন্তু নন্দপুরে যাওয়ার আগে, আকালিপুরের ব্রাহ্মণী নদীর তীরে, বটগাছের নিচে প্রথম এই মূর্তি নামিয়ে রেখেছিলেন মাঝিরা। সেই জায়গায় এখন বাঁধানো চাতাল রয়েছে। গ্রিল দিয়ে ঘিরে সংরক্ষণ করা হয়েছে ওই জায়গাকেও। আকালিপুরের ওই বটগাছতলাই গুহ্য কালীর আদি বাসস্থান বলে মেনে চলেন স্থানীয়রা। গুহ্য কালীর মহিমায়, বেঁচে উঠল বলি দেওয়া ছেলে! ওই গাছতলা থেকে বর্তমানে যেখানে মন্দির রয়েছে, সেখানে মাতৃ প্রতিমাকে নিয়ে যাওয়া হয় পরবর্তীকালে। স্থানীয়রা বলেন, ওই জায়গা থেকে মন্দিরের দূরত্ব, ১০৮ পা। ওই ১০৮ পা হাঁটার জন্য, ১০৮টি বলি দেওয়া হয়েছিল সেই সময়ে। ছাগল, মেষ, পায়রা থেকে শুরু করে, এক বালককে পর্যন্ত বলি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বলি দেওয়ার পরে, ওই বালকের মা জানতে পারেন যে, তাঁর পুত্রসন্তানকে বলি দেওয়া হয়েছে। পুত্রহারা মা কেঁদে পড়লেন মাতৃমূর্তির পায়ে। আর তারপরেই নদী থেকে জীবন্ত উঠে আসে ওই বালক। স্থানীয়রা বলেন, রাতে মন্দির থেকে বেরিয়ে, এলাকায় ঘুরে বেড়াতেন গুহ্য কালী। সকালে যখন পুরোহিত মন্দির খুলতেন, তখন মাতৃপ্রতিমার শাড়িতে লেগে থাকত চোরকাঁটা। বীরভূমের আকালিপুরের গুহ্য কালীর এই মন্দির নির্মাণেরও বিশেষত্ব রয়েছে। এই মন্দিরের আটটি কোণ রয়েছে। এর রাত্রিতে, মন্দির অসমাপ্ত অবস্থায় থাকাকালীনই নন্দকুমারের ছেলে গুরুদাস রায় এই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন গুহ্য কালীর এই প্রতিমাকে। ২০০৪ সালে এই মন্দিরের চূড়ার অংশের নির্মাণকাজ শেষ হয়। গুহ্য কালীর এই মূর্তির বিশেষত্ব হল, গোটা মূর্তির চারিদিকে বেষ্টন করে রয়েছে প্রচুর সাপ। বিশ্বাস, দেবী প্রতিমা মালা পরতে ভালবাসেন।