Success Story: কখনও আধপেটা খেয়ে, কখনও রাস্তার আলোয় পড়াশোনা! মুম্বইয়ের বস্তি থেকে NASA-য় এই যুবক
কলকাতা: স্বপ্ন দেখতে তো সবাই পারেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য কতটা লড়াই করতে হয়, তা জানেন জয়কুমার বৈদ্য। একদিকে অভাবের সংসার, অন্যদিকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। কখনও পেট ভরাতে ভরসা ছিল অল্প খাবার, কখনও রাস্তার আলোয় বসে চলেছে পড়াশোনা। একটা সময় স্কুলের ফি দেওয়ার টাকাও জোগ

কলকাতা: স্বপ্ন দেখতে তো সবাই পারেন। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য কতটা লড়াই করতে হয়, তা জানেন জয়কুমার বৈদ্য। একদিকে অভাবের সংসার, অন্যদিকে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছা। কখনও পেট ভরাতে ভরসা ছিল অল্প খাবার, কখনও রাস্তার আলোয় বসে চলেছে পড়াশোনা। একটা সময় স্কুলের ফি দেওয়ার টাকাও জোগাড় করা কঠিন ছিল। আর আজ? মুম্বইয়ের বস্তির সেই ছেলেই কাজ করছেন NASA-র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারে। তাঁর জীবন যেন বারবার মনে করিয়ে দেয়, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, স্বপ্ন দেখা থামিয়ে দিলে চলবে না। মুম্বইয়ের কুরলার বস্তিতে মাত্র ৮×১০ ফুটের একটি ছোট্ট ঘরে মা নলিনী বৈদ্য ও পরিবারের সঙ্গে বড় হয়েছেন জয়কুমার। সংসারে ছিল তীব্র আর্থিক অনটন। জয়কুমারের জন্মের আগেই তাঁর বাবা পরিবার ছেড়ে চলে যান। ফলে ছেলেকে বড় করা থেকে শুরু করে সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব এসে পড়ে মা নলিনীর কাঁধে। সংসারের খরচ চালানো, ছেলের পড়াশোনার ব্যবস্থা করা—সবটাই একা হাতে সামলাতে হয়েছে তাঁকে। পরিস্থিতি এতটাই কঠিন ছিল যে, কখনও স্কুলের ফি জমা দিতে না পারায় পরীক্ষায় বসা নিয়েও সমস্যা তৈরি হয়েছে। অথচ এই প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাননি জয়কুমার। ছোট থেকেই অভাবকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন জয়কুমার। পেট ভরে খাওয়ার নিশ্চয়তা ছিল না প্রতিদিন। কখনও বড়া পাও, কখনও সামোসা, আবার কখনও পাউরুটি আর চা খেয়েই দিন কাটাতে হয়েছে তাঁকে ও তাঁর মাকে। সংসারে যাতে দু'বেলা খাবার জোটে, তার জন্য নিরন্তর পরিশ্রম করেছেন নলিনী। মাত্র ১১ বছর বয়স থেকেই ছোটখাটো কাজ করতে শুরু করেন জয়কুমার। পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর পাশাপাশি নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল তাঁর। পরে টেলিভিশন মেরামতির কাজও করেছেন। সেই কাজ থেকে মাসে প্রায় ৪ হাজার টাকা আয় হত। পড়াশোনার খরচ জোগাতে অন্য পড়ুয়াদের টিউশনও পড়িয়েছেন তিনি। যে বয়সে অনেক শিশু খেলাধুলো আর বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটায়, সেই বয়সেই সংসারের বাস্তবতা বুঝতে শিখেছিলেন জয়কুমার। কিন্তু অভাবকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দেননি তিনি। রাস্তার আলোয় পড়াশোনা, চোখে মহাকাশের স্বপ্ন কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও জয়কুমারের আগ্রহ ছিল বিজ্ঞান ও মহাকাশ নিয়ে। ছোটবেলায় মহাকাশ অভিযান এবং বিভিন্ন গ্রহ সম্পর্কে টেলিভিশনের অনুষ্ঠান তাঁকে আকৃষ্ট করত। ধীরে ধীরে সেই আগ্রহই পরিণত হয় বড় স্বপ্নে। পড়াশোনা চালিয়ে যেতে নানা বাধার মুখে পড়তে হয়েছে তাঁকে। কখনও আর্থিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়েছে, কখনও পড়াশোনার খরচ জোগাতে নিজেকেই কাজ করতে হয়েছে। এমনকী, তাঁর পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি দেখে কেউ কেউ তাঁকে গাড়ি চালানোর কাজ বেছে নেওয়ার পরামর্শও দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু জয়কুমার অন্য স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর কাছে বিজ্ঞান ছিল শুধু পড়াশোনার বিষয় নয়, বরং পৃথিবীর বাইরে অন্য গ্রহগুলিকে জানার একটি পথ। মুম্বই থেকে আমেরিকা, বদলে গেল জীবনের দিশা জয়কুমারের শিক্ষাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় মুম্বইয়ের কেজে সোমাইয়া কলেজ অফ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে। পরে তিনি টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চে গবেষণার সুযোগ পান। সেখান থেকে তাঁর যাত্রা এগিয়ে যায় আমেরিকার ইউনিভার্সিটি অফ ভার্জিনিয়ার দিকে। সেখানে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। এই পথ মোটেও সহজ ছিল না। আর্থিক অনটন, ছোটবেলার প্রতিকূলতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার চাপ—সবকিছুর মধ্যেই এগিয়ে যেতে হয়েছে তাঁকে। তবে পড়াশোনা, গবেষণা এবং বিজ্ঞানের প্রতি নিষ্ঠা তাঁকে একের পর এক নতুন সুযোগের সামনে দাঁড় করায়। আজ NASA-য় কাজ, গবেষণার বিষয় মঙ্গলগ্রহের বায়ুমণ্ডল আজ জয়কুমার বৈদ্য NASA-র গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের প্ল্যানেটারি এনভায়রনমেন্টস ল্যাবরেটরিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। তাঁর কাজের মধ্যে রয়েছে মহাকাশ অভিযানে ব্যবহৃত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির উন্নয়ন, পরিচালনা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা। বিশেষ করে বিভিন্ন গ্রহের বায়ুমণ্ডল সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সাহায্যকারী যন্ত্র নিয়ে কাজ করেন তিনি। NASA-র MAVEN অভিযানে ব্যবহৃত Neutral Gas and Ion Mass Spectrometer বা NGIMS যন্ত্রের ডিটেক্টর ও ফিলামেন্টের কার্যকারিতা বিশ্লেষণের সঙ্গেও যুক্ত তিনি। এই অভিযান মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল এবং সময়ের সঙ্গে তার পরিবর্তন বুঝতে বিজ্ঞানীদের সাহায্য করে। অর্থাৎ, যে ছেলেকে একসময় সংসারের অভাবের সঙ্গে লড়াই করে পড়াশোনা চালাতে হয়েছে, আজ তাঁর কাজের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পৃথিবীর বাইরের গ্রহ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বাড়ানোর চেষ্টা। এই গল্প শুধু জয়কুমারের নয়, তাঁর মায়েরও জয়কুমারের সাফল্যের গল্প বলতে গেলে তাঁর মা নলিনী বৈদ্যর সংগ্রামের কথাও বলতে হয়। একা হাতে সংসার সামলানো, ছেলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা এবং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখা—এই লড়াইয়ের প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ। জীবনে সাফল্য অনেক সময় একদিনে আসে না। তার পিছনে থাকে বছরের পর বছর পরিশ্রম, ত্যাগ, ব্যর্থতা এবং নতুন করে শুরু করার সাহস। জয়কুমারের জীবনও তার ব্যতিক্রম নয়। মুম্বইয়ের ছোট্ট ঘর থেকে NASA-র গবেষণাগার—এই দীর্ঘ যাত্রা বুঝিয়ে দেয়, মানুষের শুরুর পরিস্থিতিই তার শেষ পরিচয় নয়। সুযোগ, শিক্ষা, অধ্যবসায় এবং নিজের লক্ষ্যের প্রতি নিষ্ঠা থাকলে কঠিন পরিস্থিতি পেরিয়েও অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। জয়কুমার বৈদ্যর গল্প তাই শুধু একজন ভারতীয়র বিদেশের মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় কাজ পাওয়ার কাহিনি নয়। এটি এমন এক মানুষের গল্প, যিনি অভাবের কাছে নিজের স্বপ্নকে হারতে দেননি। আর সেই কারণেই তাঁর সাফল্য আজ বহু তরুণ-তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণা।