Success Story: ছোটবেলায় চরাতেন গরু-মহিষ, তারই মধ্যে UPSC-র প্রস্তুতি! অবশেষে IAS হলেন ট্যাক্সিচালকের মেয়ে
কলকাতা: তামিলনাড়ুর ছোট্ট শহর থেকে মহারাষ্ট্রের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো—সি বনমতীর জীবনযাত্রা যেন এক লড়াইয়ের নাম। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে পরিবারের কাজে হাত লাগাতে হত তাঁকে। কখনও গবাদি পশু চরানো, কখনও বাড়ির নানা দায়িত্ব সামলানো। বাবা ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাতেন। আর্থিক অনটনের মধ্যে বড় হও

কলকাতা: তামিলনাড়ুর ছোট্ট শহর থেকে মহারাষ্ট্রের প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানো—সি বনমতীর জীবনযাত্রা যেন এক লড়াইয়ের নাম। ছোটবেলায় স্কুল থেকে ফিরে পরিবারের কাজে হাত লাগাতে হত তাঁকে। কখনও গবাদি পশু চরানো, কখনও বাড়ির নানা দায়িত্ব সামলানো। বাবা ট্যাক্সি চালিয়ে সংসার চালাতেন। আর্থিক অনটনের মধ্যে বড় হওয়া সেই মেয়েই একদিন দেশের অন্যতম কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আইএএস অফিসার হন। তবে এই সাফল্য কোনও রাতারাতি পাওয়া প্রাপ্তি নয়। এর পিছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রস্তুতি, একাধিক ব্যর্থতা, নিজের সিদ্ধান্তে অবিচল থাকা এবং পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায়বদ্ধতা। অভাবের সংসারেও পড়াশোনার স্বপ্ন তামিলনাড়ুর ইরোড জেলার সত্যমঙ্গলমে বড় হয়ে ওঠা বনমতীর পরিবারের আর্থিক অবস্থা খুব একটা স্বচ্ছল ছিল না। তাঁর বাবা ট্যাক্সি চালাতেন, মা ছিলেন গৃহবধূ। সংসারের সীমিত আয় দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটানোই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। ছোটবেলা থেকেই তাই পরিবারের কাজে সাহায্য করতে হত বনমতীকে। স্কুলের পড়াশোনার পাশাপাশি গবাদি পশু দেখাশোনার দায়িত্বও ছিল তাঁর। কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতি তাঁর পড়াশোনার ইচ্ছাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। উচ্চশিক্ষা শেষ করার আগেই বিয়ে করার জন্য পারিবারিক ও সামাজিক চাপের মুখেও পড়তে হয়েছিল তাঁকে। তবু নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তে অনড় ছিলেন বনমতী। পরিবারের সমর্থন নিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি। স্নাতক হওয়ার পর কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর কাছে শিক্ষাই ছিল নিজের জীবনকে অন্যভাবে গড়ে তোলার সবচেয়ে বড় সুযোগ। এক মহিলা কালেক্টর বদলে দিলেন জীবনের লক্ষ্য বনমতীর জীবনে আইএএস অফিসার হওয়ার স্বপ্ন কীভাবে তৈরি হয়েছিল, সেই গল্পও বেশ আকর্ষণীয়। নিজের এলাকায় এক মহিলা জেলা কালেক্টরকে দেখে তিনি অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন। একজন মহিলা যে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলাতে পারেন, গোটা জেলার কাজ পরিচালনা করতে পারেন, সেই দৃশ্য তাঁর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। এ ছাড়াও টেলিভিশনের একটি ধারাবাহিকে আইএএস অফিসারের চরিত্র তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। ধীরে ধীরে প্রশাসনিক আধিকারিক হওয়ার ইচ্ছা দৃঢ় হয়। কিন্তু স্বপ্ন দেখা আর সেই স্বপ্ন পূরণের মধ্যে যে দীর্ঘ পথ রয়েছে, তা খুব ভালোভাবেই বুঝতে পেরেছিলেন বনমতী। আর্থিক স্বনির্ভরতার জন্য ব্যাঙ্কের চাকরি ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি নিতে গিয়ে আর্থিক সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল বনমতীকে। তাই শুধু পরীক্ষার প্রস্তুতির উপর নির্ভর না করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি। ব্যাঙ্কিং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ইন্ডিয়ান ওভারসিজ ব্যাঙ্কে অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসেবে যোগ দেন। একদিকে চাকরির দায়িত্ব, অন্যদিকে ইউপিএসসি-র প্রস্তুতি—দুই সামলানো সহজ ছিল না। তবু লক্ষ্য থেকে সরে আসেননি তিনি। চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সময় ও পরিশ্রম, দুটোরই হিসাব রাখতে হত তাঁকে। একবার নয়, বারবার ব্যর্থতা! তবু থামেননি বনমতী ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় প্রথম প্রচেষ্টাতেই ইন্টারভিউ পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিলেন বনমতী। কিন্তু চূড়ান্ত তালিকায় জায়গা হয়নি। পরবর্তী প্রচেষ্টাগুলিতেও কখনও প্রিলিমিনারি, কখনও মেনস পরীক্ষার বাধা পেরোতে পারেননি তিনি। একটি পরীক্ষায় সাফল্য না পাওয়া মানেই প্রস্তুতির শেষ নয়—বনমতীর যাত্রা যেন সেই কথাই বলে। প্রতিটি ব্যর্থতার পর নতুন করে প্রস্তুতি নিয়েছেন তিনি। চাকরি সামলে পরীক্ষার প্রস্তুতি চালিয়ে গিয়েছেন। অবশেষে চতুর্থ প্রচেষ্টায় আসে সেই বহু প্রতীক্ষিত সাফল্য। ২০১৫ সালে ইউপিএসসি সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় সর্বভারতীয় ১৫২তম স্থান অর্জন করেন বনমতী। এর পর মহারাষ্ট্র ক্যাডারের আইএএস অফিসার হিসেবে তাঁর প্রশাসনিক জীবনের সূচনা হয়। সাফল্যের সময়েও পাশে থাকতে হয়েছে বাবার বনমতীর সাফল্যের গল্পে পরিবারের কঠিন সময়ের কথাও উঠে আসে। ইন্টারভিউয়ের ঠিক আগে তাঁর বাবা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারের পাশে থাকার দায়িত্ব এবং নিজের স্বপ্ন পূরণের শেষ ধাপ—দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হয়েছিল তাঁকে। এই ঘটনাই তাঁর লড়াইয়ের কঠিন দিকটি তুলে ধরে। ব্যক্তিগত উদ্বেগের মধ্যেও নিজের প্রস্তুতি ও লক্ষ্যে স্থির থাকা যে কতটা কঠিন, তা সহজেই অনুমেয়। বনমতীর গল্পের শিক্ষা কী? সি বনমতীর জীবনকাহিনি শুধু ইউপিএসসি পরীক্ষায় সফল হওয়ার গল্প নয়। এটি আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া, সামাজিক চাপের মুখেও নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা এবং ব্যর্থতার পর আবার উঠে দাঁড়ানোর কাহিনি। সবাই একই সুযোগ নিয়ে জীবন শুরু করেন না। কারও কাছে পড়াশোনার পরিবেশ থাকে, কারও কাছে থাকে সংসারের দায়িত্ব। বনমতীর ক্ষেত্রে সেই দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল চাকরি এবং কঠিন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি। তবু তিনি নিজের লক্ষ্যে পৌঁছেছেন। তাঁর যাত্রা থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা, সাফল্যের জন্য শুধু স্বপ্ন দেখলেই হয় না, সেই স্বপ্নের জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যেতে হয়। প্রথমবার না পারলে দ্বিতীয়বার, দ্বিতীয়বার না পারলে আবার নতুন করে চেষ্টা করতে হয়। কারণ, কখনও কখনও জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে ঠিক তখনই, যখন হাল ছেড়ে দেওয়ার যথেষ্ট কারণ থাকা সত্ত্বেও কেউ এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।